
বিশেষ প্রতিনিধি, নড়াইল নিউজ ২৪.কম
বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জন্মশত বার্ষ আজ বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট)। ১৯২৩ সালের এইদিনে তিনি নড়াইলের মাছিমদিয়া জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মোঃ মেছের আলি মাতা মোছাঃ মাজু বিবি। সুলতানের জন্ম বার্ষ পালনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা হাতে নিয়েছে।
জেলা প্রশাসন,এস এম সুলতান সংগ্রহশালা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি,নড়াইলের সহযোগিতায় এসব কর্মসূচি পালিত হবে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সুলতান কমপ্লেক্স ও জেলা শিল্পকলা অডিটোরিয়ামে এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, শিল্পীর মাজারে পুস্পমাল্য অর্পণ, শিল্পীর কর্মের উপর ১শ ফুট লম্বা শিশুদের অংকিত চিত্রকর্ম প্রদর্শনী, বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহনে আর্টক্যাম্প, শিশু চিত্রকর্মশালা, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, শিশুদের নিয়ে নৌকা ভ্রমন, শিল্পী এস.এম সুলতানের চিত্রকর্মের পর্যালোচনা, আলোচনা সভা ও শিল্পীর জীবনের উপর প্রামান্যচিত্র ‘আদমসুরত’।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খানসহ খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীরা শিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন বলে জানাগেছে।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
এদিকে সুলতানের চিত্রকর্মগুলো সংগ্রহ শালায় সঠিক আদ্রতা এবং স্থান সংকির্ন হওয়ায় শিল্পীর নিহজাতে আঁকা ছবি নষ্টে আশংখা। বিশ্ব মানের সংগ্রহ শালার দাবি সুলতান ভক্তদের।
যশোরের পাজিয়া এলাকা থেকে সুলতান সংগ্রহ শালা দেখতে আসা আশরাফুল আলম বলেন, এস এম সুলতানের চিত্র কর্ম বিশ্ব মানের হলেও যেখানে তার নিজ হাতে আঁকা ছবিগুলো রাখা হয়েছে। এভাবে থাকলে শিঘ্রই ছবি নষ্টসহ মান খারাপ হয়ে যাবে।
খুলনরার শিরোমনি এলাকা থেকে মরিয়াম খানম বলেন, সুলতান একজন বরেণ্য চিত্র শিল্পী ছিলেন। তার নিজের আঁকা বিশ্ব মানের চিত্র কর্মগুলো দেখে ভালো লাগলো। তবে সংগ্রহশালাটি বিশ^মানের নয়। এটি আরো উন্নতমানের করা প্রয়োজন।
এসএম সুলতান সংগ্রহ শালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী নড়াইল নিউজ ২৪.কমকে বলেন, সংগ্রহ শালার ছবি সংরক্ষনের জন্য আদ্রতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বাংলাদেশে আবাহাওয়ার আদ্রতার সমস্যা রয়েছে। এস এম সুলতান সংগ্রহ শালাটি বিশ^ মানের সংগ্রহ শালায় উন্নিতকরনের একটি প্রকল্প সরকারের সুদৃষ্টিতে আছে। আশা করছি প্রকল্পটি অনুমোদন হলে ছবিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষন করা যাবে। ছবিগুলো এক থেকে দুইশত বছরেও নষ্ট হবেনা।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
জেলা প্রশাসক ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ আশফাকুল হক চৌধূরী নড়াইল নিউজ ২৪.কমকে বলেন, আমরা এস এম সুলতান সংগ্রহ শালার উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু প্রস্তবনা ইতিমধ্যে উর্দ্ধোতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরন করেছি। এরমধ্যে রয়েছে সুলতান সংগ্রহশালা আধুনিকায়ন ও সংস্কার, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের বাসভবন সংস্কার, শিশুস্বর্গ ভবনটি সংস্কার ও গণসৌচাগার নির্মানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। আশা করছি আমরা দ্রুত এসব কার্যক্রম শুরু করতে পারবো।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান। ১৯২৩ সালের ১০ আগষ্ট তৎকালিন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশে সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা, পাখির কলকাকলীতে ভরা মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন শিল্পী এস এম সুলতান। তার পিতা মোঃ মেছের আলি মাতা মোছাঃ মাজু বিবি। চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে পিতা মাতা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। চিত্রশিল্পী এস, এম, সুলতানের ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন “পাট কাটা”, “ধানকাটা”, “ ধান ঝাড়া”, “ জলকে চলা”, “ চর দখল”, “গ্রামের খাল”, “মৎস শিকার”, “গ্রামের দুপুর”, “নদী পারা পার”, “ধান মাড়াই”, “জমি কর্ষনে যাত্রা”, “মাছ ধরা”, “নদীর ঘাটে”, “ধান ভানা”, “গুন টানা”, “ফসল কাটার ক্ষনে” , “শরতের গ্রামীন জীবন”, “শাপলা তোলা” মত বিখ্যাত সব ছবি। ১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালনী বিশ্ববিখ্যাত চিত্র শিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পলক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
সূত্র জানায়, লাল মিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২৮ সালে রুপগঞ্জ আশ্রম স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যয়ের পুত্র শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় লাল মিয়া তার একটি সুন্দর ছবি আঁকলে তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়সহ সকলে মুগ্ধ হন। শুরু হয় শিল্পী লালের রং তুলি হাতে নতুন জীবন। শিল্পী হওয়ার মনোবাসনায় লাল মিয়া পাড়ি জমান কোলকাতার উদ্দেশ্যে। কোলকাতার কাশিপুরে নড়াইলের জমিদার বাড়িতে থেকে জমিদার পুত্র অরুন রায়ের সহযোগিতায় কোলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ন হন। পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হস্তক্ষেপে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার অমায়িক আচরনে মুগ্ধ হয়ে লাল মিয়াকে তার বাসায় থাকার সুযোগ করে দেন। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতা তার নাম রাখেন শেখ মোঃ সুলতান যা আজ এস এম সুলতান নামে বিশ^ ব্যাপী পরিচিত। ১৯৪৩ সালে সুলতান খাকসার আন্দোলন নামে একটি সেবা মূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৪৪ সালে তিনি ভারত ভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
কাশ্মীরের পাহাড়ে কিছুদিন একদল উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস করেন। ১৯৪৬ সালে কাশ্মীর থেকে চলে যান সিমলায়, সেখানে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এই প্রদশর্নী তার শিল্পী জীবনের প্রথম স্বীকৃতি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ও পরে করাচিতে অবস্থান করেন। এসময় নাগী, চুগতাই, শাকে আলী, শেখ আহম্মেদসহ অনেক পন্ডিত ব্যাক্তিদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ইউরোপ ও আমেরিকা জয় করে মহান এই শিল্পী ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রাবাসে অবস্থান করে ফিরে আসেন মাতৃভূমি নড়াইলে। ১৯৫৫ সালে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়িÑপুরুলিয়ায় নন্দন কানন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিল্পী ১৯৫৬ সালে পলী কবি জসিম উদ্দিনের সাথে কয়েকদিন আবস্থান করেন। শিল্পী ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্তু যশোরের নীলগঞ্জ শশ্মানে মাঝে মাঝে ধ্যান করতেন। ১৯৬০ সালে যশোরের চাঁচড়ার জমিদার বাড়ি কিছু কাল অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে সবার অগচরে পূনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন। হারিয়ে যাওয়া লাল মিয়াকে ১৯৬৭ সালে নড়াইলের অদুরে এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়। যশোরের তৎকলীন জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরী তাকে যশোর নিয়ে আসেন। ১৯৬৮ সালে যশোরÑখুলনা ক্লাবে তার একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরীর উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের ১০ই জুলাই সুলতানের মাছিমদিয়ার বাড়িতে দি ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আটর্স উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিল্পী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধের ছবি আঁকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পী নিজ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সে সময় প্রতিদিন রাতে একটা ঝোলা ব্যাগ কাধে তিনি কাটিয়েছেন শহরের বিভিন্ন বাড়িতে। এ সময় তার সঙ্গে থাকতো আড়বাঁশি, আর কয়েকটি পোষা বেজী। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সুলতান কাছ থেকে দেখেছেন এদেশের মানুষ, প্রকৃতি, মানুষের জীবনাচার। আর নিজের বোধ ও মেধাকে শানিত করেছেন আবেগ, অনুভুতি ও উপলদ্ধির প্রয়াসে।

ছবি: নড়াইল নিউজ ২৪.কম
১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মুলতঃ এই প্রদশর্নীর মাধ্যমে এ দেশের সুশীল সমাজের তার নতুন ভাবে পরিচয় ঘটে।
কালোর্ত্তীন এই চিত্রশিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আটির্ষ্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্টীয় ভাবে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছিল।
বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল শিশুদের নিয়ে। নিজের সঞ্চিত অর্থে শহরের মাছিমদিয়া এলাকায় চিত্রা নদীর পাড়ে নিজ বাড়িতে শিশুস্বর্গ নির্মান কাজে হাত দেন। নির্মান করেন ভাসমান শিশুস্বর্গ নামের একটি নৌকা। শিল্পীর ইচ্ছা ছিল এই নৌকায় করে কোমলমতি শিশুদের সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতি দেখবেন। শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হবেন। প্রকৃতির ছবি আঁকবেন। কিন্তু তার সেই সাধ পূর্ন হওয়ার আগেই ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন। সুলতান সংগ্রহশালা প্রাঙ্গনে কুড়িগ্রামে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসক ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জন্মদিন ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট পালন করলেও এ বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট জন্ম তারিখ হিসাবে ১৯২৩-২০২৩) জন্মশত বর্ষ কর্মসূচি গ্রহন করেছে। যা নিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের মাঝেও বিভ্রান্তীর সৃষ্টি হয়েছে।